বরিশাল খবর অনলাইন নিউজ :
বদলি ঠেকাতে বরিশালে সরকারি স্কুলের তিন শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক-সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে জেল হাজতে না গিয়ে স্বেচ্ছায় নিজেদের নামে মামলা দেখিয়ে আছেন বহাল তবিয়তে। এই জালিয়াতিতে সহয়তা করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার কতিপয় পুলিশ সদস্য ও দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। কাগজে-কলমে তিন শিক্ষককে ৮১ ধারায় গ্রেফতার ও একদিন পরে আদালত থেকে জামিন দেখানো হলেও বাস্তবে এদের কেউ গ্রেফতার হয়নি। বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে তিন শিক্ষক এমন নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছেন।
অভিযুক্ত শিক্ষকরা হলেন-বরিশাল জিলা স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন, রূপাতলি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আকতারুজ্জামান ও একই স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. এ রাজ্জাক।
জানা যায়, ১০ ডিসেম্বর অভিযুক্ত ওই তিন শিক্ষকের বদলি হয় ভিন্ন ভিন্ন তিন জেলায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেনকে বদলি করা হয় নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার ওছখালী খান সাহেব ছৈয়াদিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। আকতারুজ্জামানকে বদলি করা হয় পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার সতেন্দ্র নাথ বন্দোপাধ্যায় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। একই স্কুলের আরেক শিক্ষক মো. এ রাজ্জাককে বদলি করা হয় ভোলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৩ ডিসেম্বর তারা গ্রেফতারের নাটক সাজান এভাবে-ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে নগরীর টাউন হলের সামনে তিন শিক্ষক উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছিলেন সে কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের একদিন পর ১৪ ডিসেম্বর আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তারা। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম। অথচ গ্রেফতার হওয়া ওই তিন শিক্ষকের এজাহারে তার স্বাক্ষর রয়েছে। শুধু উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার জন্য তিনজন শিক্ষককে গ্রেফতার এবং ৮১ ধারায় আদালতে সোপর্দ এটা আসলেই রহস্যজনক।
একই দিনে কোতোয়ালি থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া আসামি মিঠুন দেবনাথ, জাফর হাওলাদার ও সুমন দাসের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৩ ডিসেম্বর কোতোয়ালি মডেল থানার গারদে ছিলেন না এই তিন শিক্ষক। তাহলে প্রশ্ন রয়ে যায়, রাতে এই আসামিরা কোথায় ছিলেন? সিসিটিভি সূত্র অনুযায়ী ঘটনাস্থল টাউন হল, এরপর কোতোয়ালি মডেল থানা ও আদালত চত্বরে এই আসামিদের দেখা মেলেনি। ধারণা করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে এই তিন শিক্ষক তাদের বদলি ঠেকাতে গ্রেফতার নাটক সাজিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানার এক পুলিশ সদস্য জানান, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই গ্রেফতার নাটক সাজিয়েছে একজন অ্যাডভোকেট, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সেকেন্ড অফিসার। উক্ত ঘটনার তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে আসল সত্যতা।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো তিন শিক্ষক গ্রেফতারের বিষয়ে দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষক না জানলেও ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে বদলি ঠেকাতে শিক্ষা অধিদপ্তরে সুপারিশপত্র পাঠান দুই প্রধান শিক্ষক। একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম ও রূপাতলি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা বেগম এই গ্রেফতার নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন মোবাইল ফোনে প্রথমে গ্রেফতার হয়েছেন বলে দাবি করেন। পরে তাকে বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজে আপনাদের গ্রেফতারের কোনো তথ্য নেই কেন? এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। বাকি দুই শিক্ষককে একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠালেও তারা জবাব দেননি। পরে প্রতিষ্ঠানে গিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনা আমার জানা নেই। তিনজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক গ্রেফতার হলে তো পুলিশ ও মিডিয়ায় জানার কথা। বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।